এটা খুবই কাকতালীয় যে 1720 , 1820 এবং 1920 প্রতিটা শতাব্দীতে বিশের দশকেই কিন্তু কোনো না কোনো মহামারী দেখা দিয়েছে । বর্তমানে 2020 সালেও কিন্তু COVID-19 অর্থাৎ কোরোনা ভাইরাসের প্রকোপ বেড়েই চলেছে।
এখানে আলোচনা করা যাক্ আজ থেকে ঠিক 100 বছর আগে 1920 সালে ঘটা 'স্প্যানিশ ফ্লু' নিয়ে যার সাথে আজকের COVID-19 সংক্রমণের কিছু মিল আছে । গবেষণায় দেখা গেছে যে এর প্রকোপ চলে 1918 সালের জানুয়ারি থেকে 1920 সালের ডিসেম্বর অবধি। প্রায় 500 মিলিয়ন অর্থাৎ আনুমানিক 50 কোটি মানুষ আক্রান্ত হন যা পৃথিবীর জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ। মারা যান 1.7 কোটি থেকে 5 কোটি মানুষ । এটিকেই পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারী বলে ধরা হয় । এই রোগ দেখা যাচ্ছিল খুব বৃদ্ধ এবং একদম বাচ্চাদের মধ্যে তবে মৃত্যুর হার সব চেয়ে বেশি দেখা যায় মোটামুটি 20 থেকে 40 বছর বয়সী দের মধ্যে।
এই সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলার কারণে জার্মানি, ফ্রান্স, U.K , USA এর মতো দেশগুলো তাদের সংবাদপত্রের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করে। কিন্তু স্পেন সরাসরি এই যুদ্ধের সাথে যুক্ত ছিল না তাই তাদের সাংবাদিকদের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না এবং সেই সময় স্পেনের রাজা 'আলফানসো' এই রোগে আক্রান্ত হন। এই খবর তিনি স্পেনের সংবাদমাধ্যমের দ্বারা প্রকাশ করেন । অনেকে মনে করেন যেহেতু স্পেন থেকে খবরটি প্রথম প্রকাশ হয় তাই একে 'স্প্যানিশ ফ্লু ' বলা হয় । কিন্তু এই রোগের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত আছে।
1999 সালে এক গবেষণা প্রকাশিত হয় যেটি করা হয়েছিল একদল ব্রিটিশ গবেষক দ্বারা যার নেতৃত্ব ছিলেন Virologist John Oxford । এখানে বলা হয় 1917 এর শেষদিকে এক জন মিলিটারি প্যাথলজিস্ট উচ্চ মারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি রোগের খোঁজ পান যেটিকে পরে Flu বলা হয় এবং ফ্রান্সের Etaples নামক স্থান যেখানে U.K সৈন্যদের Hospital camp ছিলো সেটিকেই এই রোগের কেন্দ্র বলা হয় ।দেখা যায় জনবহুল এলাকা এই রোগটি ছড়ানোর জন্য আদর্শ । এটি একটি পশু(শূকর) খামার ও ছিল এবং আশেপাশের গ্রাম থেকে খাদ্য হিসেবে পোলট্রিও আনা হত। গবেষকরা বলেন এই রোগের ভাইরাসটি প্রথমে পাখিদের শরীরে আশ্রয় করত এবং সেখান থেকে সেই শূকরদের শরীরে যেত।
আবার 2003 সালে ঐতিহাসিক Alfred.W.Crosby বলেন যে পশ্চিম আমেরিকার কাঁসাস(Kansas) প্রদেশে এর সূচনা হয় । জনপ্রিয় লেখক John Barry সাল 2004 এ Kansas এর Haskell County কে এর উৎস বলে বর্ণনা করেন । ঐতিহাসিক Santiago Mata 2017 এ বলেন 1917 সালে এই রোগের প্রথম দফা আক্রমণ ঘটে, 14 টি মার্কিন সৈন্য ঘাঁটিতে এর প্রভাব পড়ে।
আক্রান্ত মানুষের কফ্ হাঁচি থেকে এটি ছড়িয়ে পড়ত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এই রোগকে আরো ত্বরান্বিত করেছিল বলে মনে করা হয় । বলা হয় সেই সময় সৈন্য রা যে সৈন্য শিবিরে থাকত সেখানকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অপুষ্টি তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয় ও তারা আক্রান্ত হয় । এরপর তারা যখন ছুটিতে বাড়ি ফিরত তখন এটি অন্যান্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে যায়। 1918 সালের জানুয়ারিতে আমেরিকার কাঁসাস এর Huskell County তে প্রথম এই রোগ দেখা যায়। 4th March 1918 সালে Albert Gitchell পেশায় রাঁধুনি এই রোগে প্রথম আক্রান্ত হন। কয়েকদিন এর মধ্যে আরো 522 জন এর শিকার হন। এরপর এটি Queens, New York শহরেও ছড়িয়ে যায় ।
2014 সালের এক গবেষণা বলছে এটির সূত্রপাত চীন দেশেই। 1917 ও 1918 সালে চীনা শ্রমিকদের কানাডায় যাওয়াও এর কারণ। এই শ্রমিকরা ছিল প্রত্যন্ত গ্রাম্য অঞ্চলের কৃষক। Mark Humphries তার "The last Plague" বইতে এমন ই বলেছেন। তারা ফ্রান্স এ যাওয়ার আগে পুরো কানাডাতে সিল করা ট্রেন containers এর মধ্যে 6 দিন কাটায়। সেখানে তাদের পরীখা খনন , রেলের লাইন পাতা , ক্ষতিগ্রস্ত tank সারাইয়ের কাজে লাগানো হয় 90,000 কর্মী এই কাজে নিযুক্ত ছিলো।
এখানে বলা হচ্ছে 25000 চীনা শ্রমিকদের মধ্যে 3000 শ্রমিকের কানাডার জীবন medical quarantine এই শেষ হয়। প্রজাতিগত ভাবে চীনাদের অসুস্থতাকে স্বাভাবিক চীনা আলস্য বলে কানাডিয়ান ডাক্তাররা গুরুত্ব দেননি কিন্তু তারা যখন ফ্রান্স যায় তখন তারা অল্পদিনের মধ্যেই মারা যায় । 1993 সালে গবেষক Claud Hannoun ও বলেন এই রোগের উৎস চীন।
এই রোগের লক্ষণ ছিল ক্লান্তি, খাওয়ার অনিচ্ছা, শুকনো কাশি, এরপর হত ঘাম, পাকস্থলীর সমস্যা এবং সবশেষে হতো শ্বাস কষ্ট । বিভিন্ন জমায়েত থেকে এটি দ্রুত ছড়াতো। 1918 র গ্রীষ্মে এটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। জুলাই তে এটি স্পেন ও ব্রিটেনে মহামারীর আকার ধারণ করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ফেরত সৈন্য দের থেকে এটি ভারতেও ছড়িয়ে পরে । 1 থেকে 2 কোটি ভারতীয় মারা যায় । বোম্বেতে এই রোগ প্রথম সংক্রামিত হয় ।
এর প্রতিরোধ হিসেবে ডাক্তাররা পরামর্শ দিয়েছিলেন বিভিন্ন জনসংযোগ এড়িয়ে চলা, Musk ব্যবহার করা ও অপরের সাথে হাত না মেলানো ইত্যাদি ।
picture source: Google
Data source: wikipidia and Google.


No comments:
Post a Comment